কেন প্রথা ভেঙে ঋতুমতী অবস্থায় পুজো করলেন পশ্চিমবঙ্গের এক ছাত্রী

single-news-image

উষসী চক্রবর্তী সরস্বতী পুজো করছেন

 

।। অমিতাভ ভট্টশালী।।

বিবিসি, কলকাতা

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যুগ যুগ ধরে এই ধারণা আছে, মাসের যে কদিন কোনও নারী ঋতুমতী থাকবেন, সেই কদিন তিনি পুজো বা কোনও রকম ধর্মীয় কাজে অংশ নিতে পারবেন না, মন্দিরে যেতে পারবেন না।

কলকাতার এক কলেজ ছাত্রী এবার তার বাড়িতে সরস্বতী পুজো করে সেই ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছেন। তার সঙ্গে তিনি এটাও জানিয়ে দিয়েছেন যে পুজোর দিন তিনি ঋতুমতী ছিলেন।

ফেসবুকে পুজোর ছবি এবং নিজের শারীরিক অবস্থার কথা ঘোষণা করার পর থেকেই তাকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়ে গেছে।

অনেকেই যেমন মন্তব্য করছেন যে অত্যন্ত সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি, তেমনই বদনামও করা হচ্ছে তাকে।

উষসী চক্রবর্তী নামের ২৩ বছর বয়সী ওই ছাত্রীকে নেট নাগরিকদের যে একাংশ ‘ট্রল’ করছেন, তাদের বক্তব্য দুটি – এক, তিনি নারী হয়ে কী করে পুজো করলেন। আর দ্বিতীয়ত, রজঃস্বলা অবস্থায় পুজো করা তো ঘোর পাপ, একেবারে অনর্থ হয়ে যাবে, এমন কি সুনামি বা ভূমিকম্পও হয়ে যেতে পারে এই অনাচারের জন্য।

শাস্ত্র বিশারদ নব কুমার ভট্টাচার্য বলছেন, “কে বলেছে মেয়েরা পুজো করতে পারবে না? এটা একেবারেই শাস্ত্রসম্মত। কিন্তু সেটা নিজের বাড়ির পুজো হতে হবে।”

দুদিন ধরে ‘ট্রলড’ হওয়ার পরে মিস চক্রবর্তী ফেসবুকে একটু বক্রোক্তি করেই লিখেছেন যে তিনি ওইসব ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দায় নিয়ে নিচ্ছেন!

উষসী চক্রবর্তী
উষসী চক্রবর্তী

মিস চক্রবর্তী বলছেন, “ভেবেচিন্তেই এই প্রথা ভেঙ্গেছি। পিরিয়ড হয়েছে এই কথাটা বলতে আমাকে যেন লজ্জা না পেতে হয়, স্যানিটারি প্যাড যেন লুকিয়ে কিনতে না হয় বা জামার পিছনে রক্তের দাগ লেগে গেলে যেন আমাকে লজ্জায় মুখ লুকোতে না হয়। কেন আমাকে কাগজের মোড়কে বা কালো প্লাস্টিকে মুড়ে স্যানিটারি প্যাড কিনতে হবে!”

“এই কথাগুলো আমার এবং আমার পরের প্রজন্মের মেয়েদের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি বলেই প্রথাটা ভেঙ্গেছি। যে কথাটা মেয়েদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বুঝিয়ে আসা হয়েছে, সেটা যে ভুল, সেটাই বলতে চেয়েছি জোর গলায়,” বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন মিস চক্রবর্তী।

কেন ভাঙ্গলেন দীর্ঘদিনের এই বিশ্বাস?

“ঋতুমতী হওয়ার মতো একটা স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থায় মেয়েরা অশুচি হয়ে যায় বলে পুজো করতে পারবে না, সেটা ঘোর পাপ! অথচ যে পুরুষ পুরোহিত পুজো করছেন, তিনি যদি ধর্ষক হন তবুও সেই পুজো শুদ্ধ হয়ে গেল?” মন্তব্য উষসী চক্রবর্তীর।

তিনি বলছিলেন, “আমি এই শুচি অশুচির নিয়ম মানবই না। মন থেকে যদি কেউ শুদ্ধ হয়, তার শুচিতা থাকে, তাহলে আর কোনও কিছুতেই সে অশুচি হয় না – এটাই আমার বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস নিয়েই আমি বাবা মায়ের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে কোন পুরাণ, কোন শাস্ত্রে এটা লেখা আছে আমাকে দেখাও, তবেই মানব। আমি ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে, তাই বাড়িতে বহু শাস্ত্রের বইপত্র আছে। আমাকে কেউ দেখাতে পারে নি, তাই পুজো করেছি।”

সরস্বতী পুজোয় মেয়ের প্রথা ভাঙ্গা দেখে মিস চক্রবর্তীর বাবা ঠিক করেছেন যে মেয়েকে এবার অন্যান্য পুজো পদ্ধতিও নিজে হাতে শিখিয়ে দেবেন।

শুধু বাবা নয়, ঋতুমতী অবস্থায় নিজে পুজো করার ব্যাপারে উষসী চক্রবর্তী পাশে পেয়েছেন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের এবং নিজের মাকে।

‘পিরিয়ড’-এর সময়টা অশুচি – এই ধারণা পাল্টানোয় মেয়েরা পাশে পাচ্ছে মায়েদের

“আমার ছাত্রীদের অনেকেই এখন ঋতুমতী অবস্থাতেও পুজোর অঞ্জলি দেয় এবং সেটা তারা করছে সবাইকে জানিয়েই।

রোহিনী ধর্মপাল ( বাঁ দিক থেকে প্রথম)
রোহিনী ধর্মপাল ( বাঁ দিক থেকে প্রথম)

সুন্দরবনের পিছিয়ে থাকা অঞ্চল থেকে আসা এই মেয়েগুলি সেই সাহসটা দেখাচ্ছে, আর এ ব্যাপারে তারা নিজেদের মায়েদের পাশে পাচ্ছে,” বলছিলেন রামকৃষ্ণ সারদা মিশন বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন এর শিক্ষিকা রোহিনী ধর্মপাল।

কলেজ শিক্ষিকা মিসেস ধর্মপালের মা গৌরী ধর্মপাল প্রথা ভেঙ্গে প্রথম নারী পুরোহিত হিসাবে বিয়ে দিতে শুরু করেন এবং সেই বিয়ের পদ্ধতিও প্রচলিত হিন্দু বিবাহ পদ্ধতির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

“ছাত্রীরা আমাকে বলে যে তাদের মায়েরা হয়তো এই প্রথাটা ভাঙ্গতে পারবে না, কারণ এটা তাদের সারা জীবনের সংস্কার। কিন্তু যখন মেয়েরা নিয়মটা ভাঙ্গছে, তখন মায়েরা পাশে দাঁড়াচ্ছে,” বলছিলেন মিসেস ধর্মপাল।

রোহিনী ধর্মপালের কথায়, “উষসী চক্রবর্তী ঠিকই করেছে তো! মেয়েরা ঋতুমতী হলে যে পুজোর কাজে অংশ নিতে পারবে না বা নিজেরা পুজো করতে পারবে না – এই ধারণার কোনও ভিত্তি নেই। এগুলো বেদ-উপনিষদে তো নেই। মনুসংহিতা এবং স্মৃতিশাস্ত্র যখন থেকে এল, এটা সেই সময়কার ধারণা। তখন তো রক্তপাত বন্ধ করার বৈজ্ঞানিক উপায় ছিল না – স্যানিটারি প্যাড ছিল না!”

“এখন স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে যদি আমরা সব কাজ করতে পারি ওই কটা দিন, তাহলে পুজো করতে পারব না কেন! আমরা যে পুরোহিত হিসাবে বিয়ে দিতে যাই, তখন তো কই কেউ জিজ্ঞাসা করে না যে আমাদের মধ্যে কেউ ওই দিনটায় ঋতুমতী কী না! পুজো যদি করতে না দেওয়া হয়, তাহলে তো মেয়েদের ওই কদিন সব কাজ থেকেই ছুটি পাওয়া উচিত। কিন্তু সেটা কি কেউ মেনে নেবে?” বলছিলেন রোহিনী ধর্মপাল। বিবিসি