সুমন সুবহান এর একগুচ্ছ কবিতা

single-news-image

আমরা সত্যিই ভালোবেসেছিলাম

ঝকঝকে কাচের দেয়াল—সীসার চাদর

আকাশ ছুঁইছুঁই শহরের কেউ জানেনা,

আমাদের জানলায় মনখারাপ করা

অনেকগুলো বিকেল ছিলো—সন্ধ্যে ছিলো,

আমাদের অনেকগুলো বিদায় সম্ভাষণ ছিলো

হৃদয় আর্দ্র করা, “আজ তবে আসি,

নিজের দিকে খেয়াল রেখো,

ওষুধটা খেয়ো ঠিকমতো, রাত জাগবেনা কিন্তু”

…এরকম আরো কতো কিছু।


বিটুমিনের রাজপথ—জেব্রা ক্রসিং—উড়াল সড়ক

ছুটে চলা ঘড়ির কাঁটা, কেউ না জানুক—

রাতজাগা ল্যাম্পপোষ্টগুলো ঠিকই জানতো,

বাষ্পরুদ্ধ চোখে তারা দেখতো—

দুটো মানুষের আঙুল ছোঁয়ার অসীম তৃষ্ণাটুকু,

ছায়ার মাপে তারা ঠিক বুঝে যেতো

আমাদের ভালোবাসার গভীরতা কতটুকু!


এই শহরে কোজাগরী রাত নেই

এখানে ডাহুকের ভেজা চোখ, নিঃসঙ্গ খন্জনা

কিংবা জোনাকির দেখা মেলেনা, এখানে—

নাগরিক বেলি ফুল আর ডোপামিন ভুরভুর সন্ধ্যেয়

সোডিয়াম লাইটের অশরীরী আলোয়—

কাজল চোখের তুমি মৌনতার অর্গল খুলে

উষ্ণতা বিলিয়ে যেতে আর—

দৃষ্টির গভীরতায় ভিজে একসা হয়ে যেতো

আমাদের অক্ষমতা গুলো।

এই নগরের হাজারো ডুবুরি চোখের মাঝে

লোকের অজস্র কোলাহলের মাঝে

আমরা দুই মিলে এক হতে শিখেছিলাম,

কারণ আমরা ভালোবেসেছিলাম।

আমাদের ভালোবাসার একটা মিষ্টি পদ্য ছিলো,

শহরের ফুটপাতে—রেস্তোরাঁয়—চৌরাস্তায়—ফোয়ারায়

আমরা ভালোবাসার লিরিক বিছিয়েছিলাম।


আমাদের ভালোবাসার দিনগুলো ছিলো

বৃষ্টির শেষে ঝলমলে রোদ্দুরের মতো,

বিকেলের কার্ণিশ বেয়ে নরম তুলোট আভা

থমকে যেতো তোমার ঠোঁটের কোণটাতে।

আমরা চোখের ইশারায় কথা বলতাম

আর অফিস ছুটির শেষে, শ্রাবণঘন দিনে

স্টাফ বাসের দিকে তাকিয়ে থাকতাম,

তোমার অমন অন্ধকার চুল—ঘন জুলফি

লুকোনো হাসি, ট্রাফিক জ্যামে হারিয়ে যেতো।

ব্যাক লাইটের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে

আমি নিকোটিনের শেষ কুণ্ডলীটা—

আকাশে ছুড়ে দিয়ে আপন ডেরায় ফিরতাম।

এই শহরের দেয়ালে সাঁটানো পোস্টার—

ব্যানার—ড্যাংলার—বিলবোর্ড না জানুক

সূতোর প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি ঠিকই জানতাম,

আমরা একদিন সত্যিই ভালোবেসেছিলাম।

♣♣♣

জুয়েলের জন্য এলিজি…
টুকরো কথা, খণ্ডিত স্মৃতি,

ফ্রেমে বন্দী তোর মুখ—

পাথর সময়—দুচোখের পাতা এক করতে পারি না।

স্মৃতি বড় প্রতারক—

অনেক কিছু আড়ালে রাখে,

বীভৎস কিছু মনে করিয়ে দেয়—

মিডিউজার সাপ, তারা তাই করে যা ইচ্ছে করতে চায়।


খণ্ডিত দেহাবশেষ —

টুকরো ভালোবাসা,

বাতাসে চামড়া পোড়া গন্ধ—

লেলিহান শিখা—ধোঁয়া—ছাই-ভষ্ম ভুলতে পারি না।

ধর্মান্ধতা বড় বিধ্বংসী—

বাসিলিস্ক সর্পের দৃষ্টিতে সভ্যতা জ্বালিয়ে দেয়,

মনুষ্যত্ব—বিবেক গিলে খায়—

মাইনোটর সব গিলে খায়, যা ইচ্ছে খেতে মন চায়।


টুকরো টুকরো মুহুর্ত—

টুকরো অক্ষমতা,

অজস্র হায়িনার চোয়ালের মাঝে—

হতভাগ্য—অসহায় কতোটা তুই--মানতে পারি না।

হুর—গিলমানের লোভে বেড়ে ওঠা হাইড্রা—

যার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে বিপন্ন মানবতা,

ধর্ম বেসাতিরা কতোটা ভয়ংকর—

রক্তবীজ, সংখ্যায় বেড়ে তাই করে যা করতে চায়।

♣♣♣

ভিন্ন আকাশের গল্প

আমি জানি আমাদের দেখা হবে না

সময়ের মাপে এই অভিযাত্রিক হৃদয়ের

গতিপথ আসলে আলাদা,

আমাদের চলার পথে, ছুঁয়ে যাওয়া নুড়ি পাথর

ভিন্ন আকাশের গল্প বলে।


একই সমান্তরালে আমাদের বসবাস তবু

অমন চিবুক ছুঁয়ে থাকা যৌনতা—

চোখের কোণে লুকোনো হাসি আর

ঠোঁটের দ্রাঘিমা স্পর্শের বড় সাধ হয়,


মাঝে মাঝে এমনো তো হয়

কাছেপিঠে যেন নাড়ির লঘু স্পন্দন পাই—

ঘাড়ের কাছে কারো নিঃশ্বাসের আলতো ছোঁয়া!

মহাকালের যে অভিপ্রয়াণ আমাদের নিয়তি—

তার থেকে আসলে মুক্তি নেই,

পললের মৃদুভাষে পদচিহ্নের দেখা না হোক!

ভালোবাসা আর্দ্র কফির গরম ধোঁয়া—

সাথে কবিতার দুটো লাইন অথবা


দ্রাক্ষারসে মেরিনেট করা ওমর খৈয়াম না হোক!

জীবনের পল—অনুপল থেকে মোটে একটা দিন!

মহার্ঘ্য কিছু ঘন্টা! নিদেনপক্ষে কিছু মুহূর্ত!

তাও না হোক!


সময়ের ব্যবচ্ছেদে দোলপূর্ণিমার রাতে—

নিরক্ষ রেখায় দাঁড়িয়ে আমার কথাটুকু ভেবো,

রোহিণী নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে—

কোন দূর অতীতের সমান্তরাল রেখার

ওটাই না হয় হোক একমাত্র ছেদবিন্দু!

♣♣♣

বলা, না বলা কথা

সময়ের ছাঁচে আমরা হাঁটি, হেঁটে যাই

সরীসৃপের শীতল অনুভূতিতে—

বইয়ের ভাঁজে চিরকুট—মলিন চিঠির মতো

আমাদের পদচিহ্ন পড়ে থাকে

স্মৃতির ফসিল রেখায়।


হেমন্তের বিষন্ন সন্ধ্যেয়—

ঝরা পাতার মর্মরে লুকনো যতো যন্ত্রণা

থরে বিথরে সাজানো মুখের ভাষা

আর না বলা কথাগুলো—


লুকোচুরি খেলে আলজিভের আড়ালে।

বিগব্যাঙ সূত্র মেনে আজ এতোটাই দূরত্বে যে

হাজারো কথার ভীড়ে আমরা এখন

কথা বলতে ভুলে গেছি।


মুখোমুখি বসা কফির টেবিলে—

কেমন আছো ? এখনো কি রাত জাগো ?

ওষুধটা খাচ্ছো কি ঠিকমতো !

এটা সেটা কতো কি জিজ্ঞেস করা হয়,

কিন্তু উত্তরটা জানা হয়না, জানতে চাই কি !


যান্ত্রিক স্বাচ্ছন্দ্যে ক্যাপাচিনোর স্বাদ আর

ঠোঁটে লেগে থাকা কুকিজের টুকরোটা সরিয়ে

আমরা প্রসঙ্গান্তরে চলে যাই।

চোখের মাপে হয়তো অনেক কিছু বলি কিন্তু

আমাদের আসলে কথা বলা হয়না—

পেঁয়াজের খোসার মতো কথা ছাড়াতে ছাড়াতে

শেষে যা থাকে অবশিষ্ট—


তা হলো অভ্যেস, যা সহজে ছাড়ানো যায় না।

কর্পোরেট হাসি মেখে কথা বলা—

এ আসলে আমাদের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে,

কে না জানে! অভ্যেসে উষ্ণতা থাকেনা—

থাকেনা শুনবার কোনো দায়ভার!

♣♣♣

তোমার শহরের গল্প

তোমার ওই যে আকাশ, নীল—নীলিমায়

দিগন্ত ছোঁয়া সবুজের মায়া! 

কালের সাক্ষী রেলের গুমটি ঘর

ম্যাড়মেড়ে ইমারত—ঝুল বারান্দা—অলিগলি

কিছুই চিনিনা আমি, 


আমি জানিনা ওই শহরের বুক পকেটে

সীসার প্রলেপ, কার্বনের সর জমেছে কিনা! 

শাড়ীর ভাঁজের মতো শহরের পাটে পাটে

ক্ষয়িষ্ণু দালানকোঠা—ধূসর কড়িবর্গা—মর্মর মূর্তি

ব্যাঙমা—ব্যাঙমির মতো কোনো অতীতের কথা বলে! 

আমি জানি না।


আমি জানিনা তোমার শহরের ধুলোমাখা পথে

হেঁটে গেছে কত মনিষী—সাধু—মহারথী,

পালাগান—উপাখ্যান থেকে উঠে আসা

মহুয়া—মলুয়া—দেওয়ানা মদিনা—চন্দ্রাবতী

তুমি তাদের মতো কিনা! 


আমি জানিনা ভালোবাসার দ্রাক্ষা রসে

যে তারা ভিজে একসা

তুমিও সে আলোর পথের যাত্রী কিনা! 

শহরের পীচগলা রাজপথ—নির্জীব ফুটপাত

শিমুল-পলাশের পারিজাতের লাল মেখে

তোমার ঠোঁটের মতো

লাল হয়ে থাকে কিনা আমি তাও জানি না।


শুধু জানি ওই আকাশের রৌদ্র ছায়ায়

সোঁদা মাটি বুনো ঘাসে

তোমার শরীরের ঘ্রাণ মিশে আছে— 

একজন নারীর ঘ্রাণ!


শুধুমাত্র তোমার কারণে— সে কারণে

শহরটা আমার কাছে আপন হয়ে গেছে

তোমাকে স্পর্শ না করেই আজ বলে দিতে পারি

তোমার শহরের গল্প, ছাইচাপা ইতিহাস।



কবি সুমন সুবহান