ঘরে ঘরে ‘মিনি হাসপাতাল’, যথেচ্ছ ওষুধ ব্যবহার, উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা

single-news-image

ছবি প্রতীকী ও সংগৃহীত

দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে যাওয়ার হার দিন দিন কমছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এ হার ৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে প্রায় ৫ শতাংশ। অন্যদিকে হাসপাতালে ফাঁকা থাকা শয্যার সংখ্যাও বাড়ছে। মোট শয্যার প্রায় ৬৮ শতাংশ শয্যাই ফাঁকা পড়ে আছে।

এমন অবস্থা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা দুই রকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কেউ বিষয়টিকে দেখছেন ইতিবাচকভাবে। আবার কেউ বলছেন এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের কথা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুর দিকে হাসপাতালে ভর্তি হতে গিয়ে হয়রানি, দুর্ভোগ এবং এরপর হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল সেটাই তাদের হাসপাতালবিমুখ করে তুলেছে। এ কারণেই মানুষ ঘরে ঘরে ‘মিনি হাসপাতাল’ গড়ে তুলেছে। তাঁরা এর বিপদের দিকটি তুলে ধরে সতর্ক করেছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, অপ্রয়োজনে হাসপাতালে ছোটাছুটি করার ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। এ ছাড়া টেলিমেডিসিনসেবা বাড়ায় হাসপাতালের ওপর চাপ কমেছে।

দেশ গত ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত কভিড-১৯ রোগী শনাক্তের ঘোষণা আসে। এরপর প্রথম কভিডে মৃত্যুর খবর জানানো হয় ১৮ মার্চ।

শুরুর দিকে উপসর্গ হলেই আক্রান্তরা ছুটেছে হাসপাতালে। কিংবা উপসর্গ না থাকলেও পরীক্ষা করা এবং শনাক্ত হলে হাসপাতালে ভর্তির জন্য উদ্গ্রীব ছিল আক্রান্তরা। অন্যদিকে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতির ছিল নানামুখী ঘাটতি। এখন ওই ঘাটতি অনেকাংশে কেটে গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বেড়েছে শয্যাসংখ্যা। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে অনেকটাই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো হয়েছে। কিন্তু আক্রান্তদের হাসপাতালে যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে।

রাজধানীর কল্যাণপুরে মসজিদ গলির বাসিন্দা সেলিম শরীফ আগে থেকেই হৃদেরাগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন। গত সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় পড়েছেন জটিল পরিস্থিতির মুখে। স্বজনরা তাঁকে অনেকভাবে বুঝিয়ে-শুনিয়ে

হাসপাতালে নিতে রাজি করাতে পারেননি। কারণ জানতে চাইলে সেলিম শরীফের সাফ কথা, ‘হাসপাতালে যাইতে ভয় করে। শুনছি, সেখানে নাকি আমার কাছে আর কাউরে যাইতে দিবে না। আবার ডাক্তার-নার্সরাও নাকি ঠিকমতো আসে না। আমি অসুস্থ, আমারে বাথরুমে কে নিয়ে যাবে? আমার কাপড়চোপড় কে ধুয়ে দিবে? বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে খাওয়াদাওয়া চলবে কেমনে? তার চেয়ে আমি বাসায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থাকি, যা হয় হবে!’

মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা দিলরুবা আক্তারের বক্তব্য, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই বলছে, শ্বাসকষ্ট না হলে হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নাই। আমার ডায়াবেটিস আছে, কিডনিতেও একটু সমস্যা আছে। কিন্তু এখনো শ্বাসকষ্ট নাই। হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছি না।’

পুরানা পল্টনে থাকেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের পাঁচজন করোনা পজিটিভ। সঙ্গে সঙ্গে বাসায় অক্সিমিটার, দুটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও আইভারমেকটিন, ডক্সিক্যাপ, এজিথ্রোমাইসিন, প্যারাসিটামলসহ আরো কিছু ওষুধ এনে রেখেছি আমার এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে। যদিও এখন পর্যন্ত প্যারাসিটামল, আইভারমেকটিন, ডক্সিক্যাপ ছাড়া আর কিছু ব্যবহার করা লাগেনি। আপাতত হাসপাতালে যাওয়া নিয়ে চিন্তা করছি না। কারণ প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে সেখানে লাখ লাখ টাকা লাগে, আবার সরকারি হাসপাতালে রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। তাই যতক্ষণ পারি বাসায় থাকব।’

প্রায় দুই সপ্তাহ আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে করোনাভাইরাস আক্রান্তদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল ৭ শতাংশের বেশি, গতকাল শুক্রবার তা কমে এসেছে ৫ শতাংশের কাছাকাছি। গত ২১ জুনের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক হিসাব অনুসারে, দেশে ওই দিন পর্যন্ত শনাক্তকৃত মোট রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠা এবং মৃতের সংখ্যা বাদ দিয়ে বাকি ৯৩ শতাংশই ছিল বাসাবাড়িতে। অর্থাৎ ৭ শতাংশ ছিল হাসপাতালে। আর গতকাল পর্যন্ত মোট শনাক্তকৃতের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠা ও মৃতের সংখ্যা বাদ দিয়ে বাকি প্রায় ৯৫ শতাংশই বাড়িতে ছিল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৫৬ হাজার ৩৯১। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছে ৬৮ হাজার ৪৮ জন। মারা গেছে এক হাজার ৯৬৮ জন। বাকি ৮৬ হাজার ৩৭৫ জনের মধ্যে হাসপাতালে অবস্থান করছিল মাত্র চার হাজার ১১৭ জন। এর মধ্যে ২০৯ জন ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। বাকিরা সাধারণ শয্যায় চিকিৎসাধীন। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ২৭৩ শয্যা। অর্থাৎ মাত্র ৩২.১৯ শতাংশ শয্যায় রোগী ছিল; বাকি ৬৭.৮১ শতাংশ শয্যা ফাঁকা। প্রায় আড়াই শ আইসিইউ শয্যাও ফাঁকা ছিল।

জাতীয় জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, শুরুতে হাসপাতালে ভর্তি হতে গিয়ে পথে পথে ঘুরে রোগীদের মৃত্যুর খবর মানুষ শুনেছে দেখেছে, সেই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে আশানুরূপ চিকিৎসা না পাওয়াসহ নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার ঘটনাগুলো মানুষের মনে প্রচণ্ড উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এতে করে মানুষ এখন হাসপাতালে না গিয়ে একরকম ঘরে ঘরেই হাসপাতাল বানিয়ে ফেলেছে।

অর্থাৎ নিজেরা হয়তো কোনো চিকিৎসকের কাছ থেকে ফোনে পরামর্শ নিয়ে কিংবা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা পরিচিতদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা কিংবা পরামর্শ শুনে সে অনুসারে ওষুধ কিনে বাসায় নিজেদের মতো চিকিৎসা করছে। অনেকে বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে মজুদ করে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে, যা কারো কারো জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে যারা বাসাবাড়িতে অক্সিজেন ব্যবহার করছে, তারা যদি ঠিকমতো এটি ব্যবহার করতে না পারে কিংবা যেসব রোগীর অন্যান্য জটিলতা রয়েছে সেটা ঠিকমতো বুঝতে না পারে তবে কোনো কোনো ওষুধ তাদের জন্য ভয়ানক বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষকে হাসপাতালবিমুখ করার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে আরো অনেকের ভূমিকা রয়েছে। আমরা অনেকেই প্রতিনিয়ত মানুষকে হাসপাতালে যেতে নিরুৎসাহ করেছি। কিন্তু মানুষ আমাদের সেই বার্তাটি সঠিকভাবে হয়তো নিতে পারেনি। এ ছাড়া অনেকে হাসপাতালে তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনে রীতিমতো ভয় পেয়ে গেছে।

আক্রান্ত হলে তারা শেষ সময় পর্যন্ত হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় থাকার মানসিকতা তৈরি করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা নিজেদের ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতার ঘাটতি ঢাকতে নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়েছেন। তা থেকে অনেক মানুষ আরো বেশি হাসপাতালের প্রতি শঙ্কিত হয়ে পড়েছে, যার পরিণতি হিসেবে এখন দিনে দিনে বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে হাসপাতালেই শত শত শয্যা খালি পড়ে থাকছে। এটাও এক ধরনের অব্যবস্থাপনারই চরম চিত্র।’

ওই রোগতত্ত্ববিদ বলছেন, “বিত্তবান অনেকের ঘরে এখন রীতিমতো ‘মিনি হাসপাতাল’ গড়ে উঠেছে। কিন্তু তাতেও আমরা শেষ রক্ষা দেখতে পাচ্ছি না। যাদের আগে থেকে বিভিন্ন রোগের জটিলতা আছে তাদের করোনা আক্রান্ত হলে হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।”

ড. মুশতাক বলেন, যারা নিজেদের উপসর্গ ঠিকমতো বুঝতে পারছে না কিন্তু অবাধে ঘোরাফেরা করছে তারা যেমন নিজের ক্ষতি করছে, অন্যদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে। শনাক্ত হলে উপসর্গ না থাকলেও তাদের আইসোলেশনে থাকতে হবে। কিন্তু অনেকেই সেটা করছে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি, সবার হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নেই। তার মানে এই নয় যে তারা সুস্থ মানুষের মতো ঘুরে বেড়াবে কিংবা পরিবারের সঙ্গে মিলেমিশে থেকে তাদের মধ্যে রোগ ছড়াবে। তবে উপসর্গ না থাকলে তাদের কোনো ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই। আর চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ তো খাওয়াই যাবে না। কিন্তু আমরা শুনতে পাচ্ছি, রেজাল্ট পজিটিভ এলেই নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধ খেতে শুরু করে দেয় অনেকেই।’

ওই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিয়ে বলেন, এখনো সময় আছে, সংক্রমণ প্রতিরোধে এলাকায় এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন গড়ে তুলে সরকারি ব্যবস্থায় পরিচালনা করতে হবে। যাদের জটিল উপসর্গ দেখা দেবে তাদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা রাখাও দরকার। যেমনটা আইইডিসিআর গত এপ্রিল পর্যন্ত ছোট পরিসরে হলেও বাস্তবায়ন করে অনেকটা সুফল পেয়েছিল।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুরুর দিকে কিছু ঝামেলা থাকলেও পরে আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় অনেক উন্নতি ঘটেছে। শয্যা বেড়েছে, চিকিৎসা জনবল বেড়েছে, সেবার মানও বেড়েছে। রোগীরা শুরুতে যত ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল এখন তারা অনেকটাই সচেতন হয়েছে। তারা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া হাসপাতলে আসছে না।’

তিনি বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেও এখন আক্রান্তদের মধ্যে যারা বাসাবাড়িতে আছে তাদের প্রায় ৮০ শতাংশকে টেলিমেডিসিনসেবা দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে রেড জোনগুলোর রোগীদের মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। যদি কেউ বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে তাকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি জরুরি করা হয়েছে। রাজাবাজারের সফলতা তাঁদের কাজের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে। কালের কন্ঠ