করোনাভাইরাসে ফ্যাকাসে ঢাকাই সিনেমার রঙিন দুনিয়া

single-news-image
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নায়িকা নুসরাত ফারিয়া

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নায়িকা নুসরাত ফারিয়া। মার্চ মাসে তার পাঁচটি চলচ্চিত্রের কাজ চলছিল। কিন্তু বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সেগুলোর সবগুলোই এখন বন্ধ হয়ে রয়েছে।

নায়িকা নুসরাত ফারিয়া বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “এখন বলা যেতে পারে, মার্চের ১১ তারিখ থেকে একেবারেই আমি ঘরে বসে রয়েছি। কারণ তখন থেকেই কলকাতার ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়।”

“এখন কলকাতায় স্বল্প পরিসরে শুটিং শুরু হয়েছে, বাংলাদেশেও কয়েকটি জায়গায় শুটিং হচ্ছে। কিন্তু সেই স্বল্প পরিসরে শুটিং করাটা আসলে কতটুকু নিরাপদ?

এবং এভাবে সীমিতভাবে অল্প টাকায়, কম টেকনিশিয়ান ও আর্টিস্টকে দিয়ে কাজ করে কি আসলে সেই একইরকম কোয়ালিটি প্রোডাক্ট পাওয়া সম্ভব? এতো বাধা যখন চলে আসে, তখন একটাই সমাধান যে এখন কাজ না করা।”

চলচ্চিত্রের শুটিং করার সময় নায়ক-নায়িকাদের অনেক সময় ঘনিষ্ঠ বা কাছাকাছি দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়। কিন্তু এখন সামাজিক দূরত্বের যে কথা বলা হচ্ছে, তা মধ্যে সেসব দৃশ্যে অভিনয় করা কতটা সম্ভব?

নুসরাত ফারিয়া বলছেন, “হয়তো প্রযুক্তি, ক্লোজআপ শট ইত্যাদি ব্যবহার করে কাছাকাছি না গিয়েও সেরকম দৃশ্য তৈরি করা যাবে, কিন্তু তাতে কি সেই মানসম্পন্ন ফলাফল পাওয়া যাবে?”

পুরোপুরিভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত পুরোপুরি শুটিং শুরু করা কতোটা ঠিক হবে, সেটা তিনি ভাবছেন। কিন্তু এর ফলে একটা অনিরাপত্তা বোধ, এটা উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে বলে তিনি বলছেন।

বাংলাদেশে আরও অনেক খাতের মতো করোনাভাইরাস ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব পড়েছে দেশটির বিনোদন শিল্প- চলচ্চিত্র জগতেও।

ভাইরাসের কারণে অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে রঙিন এই দুনিয়া।

প্রায় তিন মাস ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সব ধরণের কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে।

শুটিং হচ্ছে না, নতুন সিনেমার মুক্তি নেই, প্রেক্ষাগৃহগুলো বন্ধ।

সিনেমার পোস্টার
করোনাভাইরাসের কারণে গত তিনমাসে নতুন কোন সিনেমা মুক্তি পায়নি

 

জুন মাসের পাঁচ তারিখ থেকে একজন পরিচালক শুটিং করতে শুরু করলেও অন্যরা এখনো কাজ শুরু করেননি।

নায়ক-নায়িকারও এই পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে আগ্রহী নন।

অনেকগুলো সফল ছবির মেকআপ আর্টিস্ট সবুজ খান বলছেন, “মার্চের পর থেকেই কাজকাম নেই, সবাই সংকটে আছি। ইনকাম সোর্স বন্ধ হয়ে গেছে, সবাই জমানো টাকা ভেঙ্গে খাচ্ছি। অনেকদিন ধরেই আমরা বসে আছি। আমাদের সহকারী যারা কাজ করে, তারা আরও সমস্যার মধ্যে আছে।”

তিনি জানান, এই মাসের পাঁচ তারিখ থেকে কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বড় আকারে শুটিং শুরু হয়নি। বড় বড় শিল্পীরা কেউ আসছেন না।

জানা গেছে, শীর্ষ নায়ক-নায়িকারা জানিয়ে দিয়েছেন, করোনাভাইরাসের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা শুটিং করবেন না।

শত শত কোটি টাকা ক্ষতির মুখে চলচ্চিত্র

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে বছরে ৬০টির বেশি সিনেমা মুক্তি পায়। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে এর মধ্যেই সাড়ে তিনশো কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।

বিনোদন সাংবাদিক অপূর্ণ রুবেল বিবিসিকে বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে দুইটি করে সিনেমা মুক্তি পাওয়ার কথা। তবে সব সপ্তাহে সেরকম সিনেমা মুক্তি পায় না।

দেখা যায় মাসে পাঁচ ছয়টি সিনেমা মুক্তি পায়। বছরে প্রায় ৫০টির মতো সিনেমা মুক্তি পায়।

কিন্তু ১৮ মার্চের পর থেকে মার্চ মাস থেকে শুরু করে জুন মাস শেষ হতে চললো, এখন পর্যন্ত নতুন কোন সিনেমা মুক্তি পায় নি।

পুরো বিনোদন শিল্পই একপ্রকার স্থবির হয়ে রয়েছে বলে তিনি বলছেন।

গত ১৮ই মার্চ থেকে সিনেমার শুটিং বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশের প্রযোজক সমিতি।

পাঁচই জুন থেকে শুটিং চালুর অনুমতি দেয়া হলেও শুধুমাত্র একটি সিনেমার শুটিং হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রযোজক সমিতির সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “আমাদের শিল্পটা তিনটা স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমটা হলো যারা জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে সবেমাত্র ছবি মুক্তি দিয়েছিলেন। সেগুলোর চলা বন্ধ হয়ে গেল।

কিছু শুটিং চলছিল, সেগুলো মাঝপথে আটকে গেল। অনেকের সেন্সর করে মুক্তির অপেক্ষা করছিলেন, তাদের টাকাও আটকে গেল।”

তিনি বলছেন, সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে নববর্ষে আর ঈদে নতুন ছবি মুক্তি দিতে না পারায়।

“সারাবছর ছবি মুক্তি দিয়ে আসলে আমাদের তেমন কোন সুবিধা হয় না। কিন্তু যে কয়েকটা বড় উৎসবের ওপর সারাবছর আমরা বেঁচে থাকি।

যেমন নববর্ষ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা। দুইটা উৎসব চলে গেল, ঈদুল আযহায় কি হবে, সেটাও এখনো কোন সিদ্ধান্ত নাই।” বলছেন মি. আলম।

তিনি জানান, পুরো শিল্পের ক্ষতি হিসাব করলে এর মধ্যেই সাড়ে তিনশো কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “কারো হাতে কাজ নেই। কোন প্রযোজক বিনিয়োগ করছে না। যেসব ছবি শুরু হয়েছিল, সেগুলো বন্ধ হয়ে আছে।

ফলে এক কথায় বলা যায়, কোন পরিচালক এখন আর ভালো নেই। সবাই হাত গুটিয়ে বসে আছেন।”

তিনি জানাচ্ছেন, তারা আবার শুটিং শুরু করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পুরোপুরি শুরু করা যায়নি। টুকটাক ডাবিং, এডিটিং এসব হচ্ছে।

শুটিং শুরু হতে ঈদুল আযহা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে তিনি মনে করছেন।

তারপরেও তা ঠিক মতো শুরু হবে কিনা, সেটি নির্ভর করছে করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি কি হবে, তার ওপর।

এর মধ্যেই একশোটি সিনেমা নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রণোদনা চেয়েছে বাংলাদেশে প্রযোজকরা।

কষ্টে থাকা চলচ্চিত্র কর্মীদের সাহায্যে তিন কোটি টাকা বরাদ্দ পেলেও প্রণোদনার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

তবে সিনেমা হল খোলা হলে পুরনো ভালো ছবি নতুন করে চালানোর কথা ভাবছে প্রযোজক সমিতি।

শঙ্কায় সিনেমা হল মালিকরা

ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ বাংলাদেশ ৮৮টি সিনেমা হল চালু ছিল। কিন্তু নতুন করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর এর কতোগুলোকে আবার চালু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

বিনোদন সাংবাদিক সাংবাদিক অপূর্ণ রুবেল বলছেন, “আগে থেকেই বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা কমছে। অনেক হল মার্কেট হয়ে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে।

তাদের ভাড়া দিতে হয়, কর্মীদের বেতন-ভাতা আছে। এভাবে মাসের পর মাস বন্ধ থাকলে এদের অনেকগুলোই আবার সিনেমা চালানোর জন্য নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারবে না।”

ঢাকার একটি নামী সিনেমা হল মধুমিতার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, “অনেক বছর ধরেই আমাদের সিনেমা হলগুলো সংকটে ভুগছে। কারণ ভালো ছবি নেই, ফলে সিনেমা হলগুলোর সংখ্যা কমতে কমতে ১৪০০ থেকে ১২০০, সেখান থেকে তিনশো, এখন একশোয় এসে ঠেকেছে।

আসলে চালু আছে ৮৮টি। তারপরেও কনটেন্টের অভাবে ব্যবসা করার মতো সিনেমা পাওয়া যয় না, ব্যবসা হয় না।”

“এখন করোনা এসে সেই কফিনে লাস্ট পেরেক ঠুকে দিয়েছে। পরিস্থিতি যদি ভালোও হয়, তাহলেও সিনেমা হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে হল চালু রাখা- এসব কারণে আমার মনে হয় অনেক হল খুলবেই না।

এসব নিয়ম মানতে হলে যেসব বাড়তি খরচ হবে, অনেক মালিক সেটা বহন করতে পারবে না। ফলে আপাতত আমাদের সিনেমা হল খোলার কোন সম্ভাবনা নাই।” বলছেন মি. নওশাদ।

তিনি আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে এখন যে ৮৮টি সিনেমা হল চালু আছে, তার ৩০/৪০টি একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। বিবিসি