করোনা রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’, প্রাণ গেল হাসপাতালের আগুনে!

single-news-image

মো. মাহবুব আল হীরক চৌধুরী। বয়স ৫৭ বছর। পেশায় ছিলেন এক ব্যবসায়ী। ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিয়ে গত ১৫ মে ভর্তি হয়েছিলেন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় হাসপাতালের করোনা ইউনিটেই চিকিৎসা চলছিল তার। তবে করোনা টেস্টের পরপর দুটি রিপোর্টই নেগেটিভ আসলেও আগুন কেড়ে নিলো তার প্রাণ।

গতকাল বুধবার রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালের করোনা ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা গেছেন ওই ব্যবসায়ী। এদিন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ঘণ্টা দুয়েক আগেই হাসপাতালে বাবার খোঁজখবর নিতে গিয়েছিলেন তার একমাত্র ছেলে মনিরুজ্জামান।

তিনি জানান, যেহেতু বাবা করোনা ইউনিটে আইশোলেশনে ছিলেন তাই বাবার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে পারেননি তিনি। কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফেরার কিছুক্ষণ পরই জানতে পারেন বাবা আগুনে মারা গেছেন।

মাহবুবের ছোট ভাই নাঈম আহমেদ জুলহাস দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমার আব্বার পরে আমাদের অভিভাবক ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আলহাজ্ব। আমার ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত দান করেন।’

ভাইয়ের পরিবার নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভাইয়ের এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাদের দুজনেরই বিয়ে হয়েছে। ছেলে দেশের প্রতিষ্ঠিত একটি কোম্পানিতে কাজ করেন।’

হাসপাতালের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল জানিয়ে নাঈম আহমেদ জুলহাস বলেন, ‘গত ১৫ মে আমার ভাইকে ইউনাইটেডে ভর্তি করা হয়েছে। করোনা উপসর্গ রয়েছে বলে চিকিৎসরা তাকে করোনা ইউনিটেই আইসোলেশনে রেখেছিলেন। হাসপাতালে দুবার তার করোনা টেস্ট করা হয়েছে। সেই রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। তবুও চিকিৎসকরা বলেছিল, তৃতীয়বার একটি করোনা টেস্ট করেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই টেস্টের ফলাফল জানার আগেই তো গতকাল রাতে আগুনে পুড়ে মারা গেলেন।’

‘এখানে ইউনাইটেড হাসপাতালের অবশ্যই গাফেলতি ছিল। আমার ভাতিজা গতকাল হাসপাতালেও গিয়েছিল। কিন্তু বাসায় ফেরার পরই আগুনের খবর পায়’ যোগ করে নিহতের ছোট ভাই।

নাঈম আহমেদ জুলহাস আরও জানান, ভাইয়ের লাশ দাফনের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকার একটি কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হবে।

উল্লেখ্য, গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডে আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন পাঁচজন রোগী মারা গেছেন। সব রোগীদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে গতকাল রাতেই জানিয়েছিল ইউনাইটেড হাসপাতাল। নিহতরা অন্যরা হলেন-মো. মনির হোসেন (৭৫), ভারনন এ্যান্থনী পল (৭৪), খাদেজা বেগম (৭০) ও রিয়াজ উল আলম (৪৫)।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘করোনা ইউনিটে পাঁচজন রোগী ছিল। তাদের সবার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।’

‘পাঁচজন রোগীর সঙ্গে একজন চিকিৎসক ও একজন নার্স সেসময়ে ডিউটিতে ছিলেন। আগুন লাগার পর তারা হামাগুড়ি দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছেন। এই মোট সাতজন ছিল সেই করোনা ইউনিটে’, যোগ করেন ইউনাইটেড হাসপাতালের এই কর্মকর্তা।

এর আগে বুধবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালে আগুনের সূত্রপাত হয়। হাসপাতালের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে। পরে হাসপাতালের ভেতর থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিনিউকেশনে অ্যান্ড বিসনেস ডেভেলপমেন্টেরের হেড ডা. সাগুফতা আনোয়ার।

এরপর মধ্যরাতেই ইউনাইটেড হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে এক বিবৃতি দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে বলা হয়, গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি ২৭ মে আনুমানিক রাত সাড়ে নয়টার দিকে হাসপাতাল সংলগ্ন মূল ভবনের বাইরে ইউনিটে সম্ভবত বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের মাধ্যমে আগুনের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং আগুন আইসোলেশন ইউনিটের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সেই সময় আবহাওয়া খারাপ ছিল ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। বাতাসের তীব্রতায় আগুন প্রচণ্ড দ্রুততার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ফলে দুর্ভাগ্যবশতভাবে সেখানে ভর্তি পাঁচজন রোগীকে বাইরে বের করে আনা সম্ভব হয়নি এবং ভেতরে থাকা এই পাঁচজন রোগী মৃত্যুবরণ করেন। এই আইসোলেশন ইউনিটের পাঁচজনের সবাই করোনা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিলেন।

দমকল বাহিনীকে তাৎক্ষণিক খবর দেওয়া হয়। হাসপাতালের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ও দমকল বাহিনীর সহায়তায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে দমকল বাহিনী তদন্ত করছেন এবং ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই সম্পর্কে তাদেরকে সহায়তা প্রদান করছে, বলা হয় বিবৃতিতে।

এতে আরও বলা হয়, ‘এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় পাঁচজন রোগীকে আমরা হারিয়েছি। তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে আমরা ইতিমধ্যে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেছি। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আমাদেরকে যথেষ্ট সহায়তা করছেন। ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স কর্মকর্তা-কর্মচারী পক্ষ থেকে আমরা এই ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি।’ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পরিবারকে আগুনের ঘটনায় আতঙ্কিত না হতে বিবৃতিতে অনুরোধ করেন ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমাদের সময়