নক্ষত্রের বিদায়…

single-news-image

বিশেষ ফিচার: শাহ আলমগীর


ঢাকা ডন ডেস্ক: শাহ আলমগীর বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।  এই নক্ষত্রটি ঝরে গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে। হারিয়ে গেল মহাকাশ থেকে মহাকাশান্তরে। আচমকা উল্কাপাতের মতো তিনি ছুটে গেলেন দূর অজানায়। আর কোনোদিন তিনি আসবেন না ফিরে। পেছনে রেখে গেলেন ইহজাগতিক কর্মকাণ্ড, সাফল্য-স্মৃতি, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতা ও সম্মাননা।

মানুষ চিরবিদায় নেয়; রেখে যায় স্মৃতি। শাহ আলমগীরও যাত্রা করেছেন অনন্তলোকে−রেখে গেছেন অনেক কীর্তি ও স্মৃতি। কাঁদিয়ে গেছেন অনেককে। সদালাপী, সজ্জন ও গুণী এই ব্যক্তিটি অনেকটা অসময়েই চলে গেলেন। রেখে গেলেন অনেক সাফল্য ও পর্বতপ্রমাণ জনপ্রিয়তা।

ঢাকা ডন পরিবার  তাঁর এই অকাল প্রস্থানে ব্যথিত ও শোকাহত।

সম্মননা গ্রহণ করছেন প্রয়াত শাহ আলমগীরের স্ত্র ফৌজিয়া বেগম

প্রয়াত শাহ আলমগীর  ছিলেন প্রথিতযশা সাংবাদিক। তিনি  প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি)  মহাপরিচালক ছিলেন।  পিআইবিতে যোগ দেয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন।  উল্লেখ্য যে, তিনি তৃতীয় মেয়াদে পিআইবি’র মহাপরিচালক নিযুক্ত হয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেন।

শাহ আলমগীরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলায়। বাবার চাকরির সুবাদে তার জীবনের একটি বড় অংশ কাটে বৃহত্তর ময়মনসিংহে।

ময়মনসিংহ গৌরীপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন করে পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এছাড়া তিনি মস্কো ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা ও থমসন ফাউন্ডেশন পরিচালিত সাংবাদিকতায় উচ্চতর কোর্স সম্পন্ন করেন।

করাচিতে সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া আয়োজিত ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়া বিষয়ক কর্মশালা, ফিল্ম আর্কাইভস আয়োজিত ফিল্ম অ্যাপ্রিশিয়েসন কোর্স ও ভারতের গোয়ায় ইউএনডিপি আয়োজিত ‘সাউথ এশিয়ান মিডিয়া অ্যান্ড ইটস রোল ইন অ্যাটেইনিং দ্য মিলেনিয়াম ডেভেলপমন্ট গোল’ শীর্ষক সম্পাদকদের কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন।

চ্যানেল আই-এ প্রচারিত স্মরণসভায় সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনেরা স্মরণ করেন মরহুম শাহ আলমগীরের অবদান

শাহ আলমগীরের সাংবাদিকতা পেশার শুরু ছাত্রজীবন থেকেই। উপমহাদেশের প্রথম শিশু-কিশোর সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন।  এখানে তিনি সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত।

এরপর তিনি সাংবাদিকতা করেন দৈনিক জনতা, বাংলার বাণী, আজাদ ও সংবাদে। প্রথম আলো প্রকাশের সময় থেকেই তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত যুগ্ম বার্তা-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি টেলিভিশন মিডিয়ায় কাজ শুরু করেন। চ্যানেল আই-এর প্রধান বার্তা সম্পাদক, একুশে টেলিভিশনে হেড অব নিউজ, যমুনা টেলিভিশনে পরিচালক (বার্তা) এবং মাছারাঙা টেলিভিশনে বার্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শাহ আলমগীর স্মরণসভার একটি দৃশ্য

সাংবাদিকতার পাশাপাশি শাহ আলমগীর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি শিশু কল্যাণ পরিষদ এবং শিশু ও কিশোরদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘চাঁদের হাট’এর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন। শাহ আলমগীর ২০১৩ সালের ৭ জুলাই পিআইবির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পিআইবিতে যোগদানের পূর্বে তিনি সর্বশেষ এশিয়ান টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শেষ যাত্রায় প্রেসক্লাব ঘুরে গেলেন শাহ আলমগীর

আপলোড: শাহনাজ শারমিন

পারিবারিক জীবনে শাহ আলমগীর এক পুত্র ও কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম ফৌজিয়া বেগম। ছেলে আশিকুল আলম দীপ ও মেয়ে অর্চি অনন্যা। তার পুত্রবধূর নাম তানজিয়া সিরাজ তূর্জি। একমাত্র নাতি আহান আলম।

ঢাকা ডন সম্পাদক কথাশিল্পী ও সংগীত শিল্পী হাসান জাহিদ সম্প্রতি কথা বলেছেন প্রয়াত শাহ আলমগীরের স্ত্রী ফৌজিয়া বেগম মায়ার সাথে। ফৌজিয়া বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানসহ এমএ। কেমন কাটছে তাঁর জীবন? কেমন যাচ্ছে শাহ আলমগীর ও ফৌজিয়া বেগম দম্পতির ছেলে, মেয়ে ও নাতির সময়?

ফৌজিয়া বেগম তাঁর অনুভূতি, আক্ষেপ ও দিনকাল সম্পর্কে আলোকপাত করার মতো মনের অবস্থায় এখনও পৌঁছুতে পারেননি । তিনি কিছু ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঘটনাক্রমে উল্লেখ্য যে, সম্পাদক হাসান জাহিদ ও ফৌজিয়া বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে সহপাঠী ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবনে শাহ আলমগীর ছিলেন বন্ধুবৎসল, দায়িত্বশীল স্বামী ও পিতা। সংগীত, সংস্কৃতি ও চারুকলা অনুরাগী ছিলেন তিনি।

ফৌজিয়া বেগম

জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর অনেক সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৬, চন্দ্রাবতী স্বর্ণপদক ২০০৫, রোটারি ঢাকা সাউথ ভোকেশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০০৪, কুমিল্লা যুব সমিতি অ্যাওয়ার্ড ২০০৪, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল লাইফ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়্যার্ড-২০১৬ প্রভৃতি।

২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে  তিনি পরলোকগমন করেন। অনেকদিন ধরে রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন শাহ আলমগীর। এর আগে চিকিৎসার জন্য কয়েকবারই তিনি সিঙ্গাপুর গমন করেছিলেন।

পল হ্যারিস ফেলো

তাঁর মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

কর্মস্থল পিআইবি ও জাতীয় প্রেসক্লাবে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান রাজনীতিক, তার সহকর্মী ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ কর্মীরা।

দেশের সাংবাদিকতা জগতের উজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব মো. শাহ  আলমগীরের অন্তর্ধানে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা পূরণ হবার মতো নয়।

দেশ-সমাজ ও সাংবাদিকতায় যে অবদান তিনি রেখে গেছেন, তা প্রাতঃস্মরণীয়। তিনি ইহলোকে নেই, আছেন আমাদের মননে,মনে ও চেতনায়।