বরিস জনসন: ব্রিটেনের বিতর্কিত নতুন প্রধানমন্ত্রী

single-news-image

বরিস জনসন- ব্যতিক্রমী এক রাজনীতিক

একবছর আগেও তার সবচেয়ে কট্টর সমর্থকও যা স্বপ্নেও ভাবেননি, সেটাই অর্জন করেছেন বরিস জনসন।

মঙ্গলবার তিনি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। সেই সুবাদে বুধবার তিনি হচ্ছেন নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

ছোটবেলায় পুরো পৃথিবীর রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন বরিস জনসন। ৫৫ বছর বয়সে হয়েছেন ক্ষমতাসীন টোরি পার্টির রাজা। ব্রেক্সিট অর্থাৎ ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনার জন্য উদগ্রীব যে জনগোষ্ঠী তারাই এখন তার অনুগত প্রজা।

অহমিকা আর ব্যক্তিত্বে মোড়া রাজনীতিক

ব্রিটেনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বিতর্কিত রাজনীতিক কে?

এই প্রশ্নে ১০ জনের আট জনই হয়তো বলবেন – বরিস জনসন।

শুধুই যে বিতর্কিত তাই নয়, অনেক দিক থেকে ব্যতিক্রমীও বটে।

বাচনভঙ্গি, শব্দের ক্ষুরধার ব্যবহার, চাহনি, মজা করে কথা বলার অসামান্য ক্ষমতা, এলোমেলো চুল, ব্যক্তিগত জীবন – এসবের বিবেচনায় তিনি অন্য দশজন রাজনীতিকের থেকে আলাদা।

বিয়ে না করেই বসবাস করছেন তার থেকে প্রায় ২৫ বছরের বয়সে ছোটো এক বান্ধবীর সাথে।

বরিস জনসন এবং ক্যারি সিমন্ডস হবেন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের প্রথম অবিবাহিত দম্পতি।

বিবিসির রাজনীতি বিষয়ক সম্পাদক ল্যরা কুনসবার্গ বলছেন, “বরিস জনসন এমন একজন রাজনীতিক যাকে অবজ্ঞা করা অসম্ভব, তার অহমিকা মিশ্রিত ব্যক্তিত্বের সাথে পাল্লা দেওয়া কোনো রাজনীতিকের পক্ষে দুরূহ কাজ।”

২০০৮ সাল থেকে দু দফায় লন্ডনের মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে বরিস জনসন যখন আবার টোরি পার্টির টিকেটে সংসদ নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, “আমি মাঠে আমার তারকা খেলোয়াড়দের চাই।”

অবশ্য পরে ব্রেক্সিট গণভোটের সময় বরিস জনসনই ডেভিড ক্যামেরনের পিঠে ছুরি মারেন। নেতার বিরুদ্ধে গিয়ে ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করেন। ব্রেক্সিট শিবিরের নেতা হয়ে পড়েন।

ব্রেক্সিটপন্থীদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন বরিস জনসন
ব্রেক্সিটপন্থীদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন বরিস জনসন

মার্কিন নাগরিক

আলেকজান্ডার বরিস দ্য ফেফেল জনসনের জন্ম নিউ ইয়র্কে। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব রেখে দিয়েছিলেন।

ব্রিটেনের অভিজাত সমাজের আদর্শ প্রতিনিধি তিনি।

বাবা ছিলেন কূটনীতিক। কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে ইউরোপীয় সংসদের সদস্যও হয়েছিলেন।

অত্যন্ত অভিজাত স্কুল ইটনে পড়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও এখন তাকে কনজারভেটিভ পার্টির কট্টর ডানপন্থী অংশের প্রতিনিধি হিসাবে বিবেচনা করা হয়, ছাত্র জীবনে অল্প সময়ের জন্য বামধারার সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুনোর পর পেশা হিসাবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। দি টাইমস পত্রিকায় কাল্পনিক একটি উদ্ধৃতি ব্যবহারের জন্য চাকরি খুইয়েছিলেন।

তারপর আরো দুই একটি পত্রিকায় কাজ করার পর যোগ দেন বিখ্যাত দ্য টেলিগ্রাফে। ব্রাসেলসে ঐ পত্রিকার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতেন।

২০০১ সাল থেকে তৎকালীন বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির টিকেটে এমপি নির্বাচিত হলেও তিনি কখনও ছায়া মন্ত্রিসভায় ঢোকেননি। দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা তাকে তেমন পছন্দ করতেন না।

২০০৮ সালে সংসদের রাজনীতি ছেড়ে তিনি লন্ডনের মেয়র নির্বাচিত হন। এবং তখনই ব্রিটেনের রাজনীতিতে ভিন্ন এক মাত্রা পেয়ে যান বরিস জনসন।

মুসলিম হেরিটেজ

বরিস জনসনের প্রপিতামহ অর্থাৎ তার দাদার বাবার নাম ছিল আলী কেমাল। জাতিতে তুর্কি মুসলিম।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে আলী কেমাল প্রথমে একজন সাংবাদিক ছিলেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। অটোম্যান মন্ত্রিসভায় খুব কম সময়ের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।

১৯২০ এর দশকে আলী কেমাল গণপিটুনিতে নিহত হন।

পত্রিকায় তার এক কলামে বোরকা পরা নারীদের চিঠির বাক্সের সাথে তুলনা করার পর প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন বরিস জনসন
পত্রিকায় তার এক কলামে বোরকা পরা নারীদের চিঠির বাক্সের সাথে তুলনা করার পর প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন বরিস জনসন

বাবার সূত্রে তার বংশের ইতিহাস জানতে, স্বজনদের সাথে দেখা করতে বরিস জনসন একবার তুরস্কে গিয়ে বেশ কিছুদিন ছিলেন।

তার মুসলিম হেরিটেজের কথা মাঝেমধ্যেই প্রকাশ্যে বলেন বরিস জনসন। । তবে সম্প্রতি বোরকা পরা নারীদের নিয়ে তার এক কটু মন্তব্যের পর তাকে মুসলিম বিদ্বেষী হিসাবে অনেক গালমন্দ শুনতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীত্বের স্বপ্ন

২০১৬ সালে বেক্সিট গণভোটে হারার পর ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রীত্ব এবং দলের নেতৃত্ব ছাড়ার পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রতিযোগিতায় যোগ দেন বরিস জনসন।

তবে টেরিজা মের সাথে এঁটে উঠতে পারবেন না বুঝতে পেরে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান।

পরে কনজারভেটিভ পার্টির ব্রেক্সিটপন্থীদের চাপে বরিস জনসনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেন টেরিজা মে।

কিন্তু যেভাবে টেরিজা মে ইউরোপীয় কমিশনের সাথে ব্রেক্সিট চুক্তির জন্য মীমাংসা করছিলেন তাতে প্রচণ্ড নাখোশ ছিলেন বরিস জনসন। ২০১৮ সালের জুলাইতে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর তার ব্রেক্সিট চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন পেতে বার বার ব্যর্থ হওয়ার পর চাপের মুখে টেরিজা মে যখন দলের নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নতুন সুযোগ লুফে নেন বরিস জনসন।

টেরিজা মে
টেরিজা মে তার ব্রেক্সিট চুক্তিতে অনুমোদন পেতে ব্যার্থ হয়ে পাদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন করে প্রধানমন্ত্রীত্বের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বরিস জনসন

৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রয়োজনে কোনো চুক্তি ছাড়াই তিনি ব্রিটেনকে ইইউ জোট থেকে বের করে আনবেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে কনজারভেটিভ পার্টির ব্রেক্সিটপন্থী শিবিরের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন তিনি।

মঙ্গলবার ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায় কনজারভেটিভ পার্টির ৬৭ শতাংশ সদস্যের সমর্থন পেয়ে দলের নেতা হয়েছেন বরিস জনসন। বুধবার হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে ব্রেক্সিট নিয়ে তার দল, এবং পুরো ব্রিটিশ রাজনীতিতে যে বিভেদ, মতানৈক্য চলছে, তাতে অক্টোবরের মধ্যে তিনি তার দেশকে ইইউ থেকে বের করে আনতে পারবেন কিনা- তা নিয়ে বিরাট সন্দেহ রয়েছে।

যদি না পারেন, বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ খুবই সংক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছর এই মাসে অর্থাৎ ২০২০ সালে তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন তা নিয়ে অনেক বাঘা বাঘা রাজনৈতিক বিশ্লেষকও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিবিসি