অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পাঁচটি টিপস

single-news-image

কানাডায় অনেক নবাগতই মানসিক সমস্যায় ভুগেন। ছবি : আইরিশ টাইমস

কানাডায় উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা অভিবাসীদের মনে যেসব পরিভাষা জেগে থাকে সেগুলি হলো – সুযোগ, স্বাধীনতা ও সাফল্যের দেশ। এখানে না আসা পর্যন্ত তাদের বিবেচনায় উদ্বেগ, বিষন্নতা এবং মানসিক রোগের কথা খুব কমই স্থান পায়।

১৪ বছর আগে আমি যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে কানাডায় আসি তখন যদিও আমি ভাগ্যবান ছিলাম কারণ পরিবারের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পেয়েছি, তবু আমি নিজেকে চরমভাবে বিচ্ছিন্ন ও সাংস্কৃতিকভাবে বিযুক্ত বোধ করেছি।

আমি নিশ্চয়ই পেশাদার সহায়তা অথবা কাউন্সেলিং থেকে উপকৃত হতে পারতাম, কিন্তু সেজন্যে কী করতে হবে বা কিভাবে সেই সহায়তা পাওয়া যায় তা আমার জানা ছিলো না। সবচেয়ে বড় কথা আমি অভিবাসন পাবার পরীক্ষায় নিজের দুর্বলতা নিয়ে হাজির হতে বা “ব্যর্থ হতে চাইছিলাম না।” এখন আমি জানি এধরণের অনুভূতি কেবল আমার একারই ছিলো এমন নয়।

অনেক নবাগতেরই জীবনের একটি চরম বাস্তবতা হলো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যা। পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, প্রতি পাঁচজন কানাডীয়র মধ্যে একজন জীবনের কোনও না কোনও সময়ে মানসিক রোগে ভুগেছেন এবং প্রতি ১০ জনের মধ্যে সাতজন মনস্তাত্বিক সমস্যার লক্ষণ নিয়েই বেঁচে থাকে যারা কোনওরকম চিকিৎসাই পায় না। অবশ্যই নবাগতরা এক্ষেত্রে অনেক নাজুক অবস্থায় থাকে এবং যদি অতোটা নাও হয় তবু অভিবাসী জীবনের সহজাত প্রভাব তাদের ওপর থাকেই। এর সঙ্গে মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি মিলে এমন জটিলতা সৃষ্টি করে যে এর থেকে উত্তরণের জন্য সহায়তা পাবার সুযোগও তারা নিতে পারে না।

এদেশে আমার প্রথম বছরে যেটি আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে সহায়ক হয়েছিলো সেটি হলো দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ দেয় এমন একটি যুব কর্মসূচিতে যোগদান, একটি স্টাইপেন্ড ও একটি স্কলারশিপের টাকা যা আমাকে টরন্টোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দিয়েছিলো। পরে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবী হিসাবে আমার কাজ হলো আমার ক্লায়েন্টদের সাহায্য করা, যাদের অর্ধেকরও বেশি অভিবাসী। আমি তাদের শেখাই, কী করে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়, সংশ্লিষ্ট প্রভাব কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হয় এবং কিভাবে এ সম্পর্কিত পরিষেবা ও সহায়তা পাবার সুযোগ করে নিতে হয়। আমি তাদেরকে মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে এবং মনস্তাত্বিক কল্যাণের সমন্বয় সাধন করতেও শেখাই।

একজন রোগীর পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছি সেটি হলো, “মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণ কী?” দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, উত্তরটা সোজাসুজি দেওয়ার উপায় নেই, কারণ অনেকের স্বাভাবিক আচরণও অন্যদের কাছে উদ্ভট ও অগ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।

অবশ্য তার পরও কিছু লক্ষণ তো আছেই, সেটা হলো কারও মনোভাব, চিন্তাভাবনা বা ব্যবহারে বড় ধরণের পরিবর্তন, বিশেষ করে যদি এর মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কোনও ঝুঁকির ব্যাপার থাকে। এর কিছু উদাহরণ হলো মনোভাবের চরম দোদুল্যমানতা, সামাজিক মেলামেশা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, আগে যেসব বিষয়ে আনন্দ পেতো সেসবে আর আগ্রহ বোধ না করা, নিজের যতœ নেওয়ার ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়া অথবা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ইত্যাদি। এটি কোনওভাবেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়। তবে যদি আপনি কাছের কারও মধ্যে এসব লক্ষণ দেখতে পান অথবা নিজের মধ্যে তাহলে কোনও চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক পেশাজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

আমার সমস্ত কর্মজীবনে আমি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি শিখেছি সেটি হলো, মানুষের জীবন বিস্ময়করভাবে বহু স্তরবিশিষ্ট এবং জটিল। তাই এটা মোটেই অবাক হবার মত ব্যাপার নয় যে, সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে এমন কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপত্র নেই। তেমনই মানসিক রোগে আক্রান্ত হবারও কোনও একক ও সুনির্দিষ্ট কারণও নেই। মানুষের বংশগতি, পরিবেশ এবং শৈশবের কোনও মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা ইত্যাদি সব কিছুরই ভূমিকা থাকতে পারে কারও অসুস্থ হবার পেছনে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক চিকিৎসকের সঙ্গে যখন কেউ দেখা করেন তখন তার মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক পরস্পর সম্পর্কিত বিষয় যেমন- মানসিক আঘাত, ক্ষতি, সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, মাদকাসক্তি, চলমান বৈষম্যের অভিজ্ঞতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা নিজের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়ার অনুভূতি ইত্যাদি নানা কারণ অসংখ্য উপায়ে তাকে স্বাভাবিক বোধ থেকে বিচ্যুত করে থাকতে পারে। সুতরাং আমার ক্লায়েন্টদের প্রত্যেকের নিজের অবস্থা ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় যার মধ্যে সচরাচর কাউন্সেলিং, সহায়ক গ্রুপের সাহায্য নেওয়া বা রোগীর নিজের কমিউনিটির একজন কর্মীর সঙ্গে দফায় দফায় সাক্ষাতের প্রচলিত ব্যবস্থাপত্রের আকারে বিভিন্ন ধরণের থেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকে। বেশি খারাপ অবস্থার রোগীর ক্ষেত্রে ওষুধ প্রয়োগ করার প্রয়োজন হয়।

রোগীর মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রয়োজন আছে কিনা সেটা দেখাও আমাকে লক্ষ্য রাখতে হয়। তারা কি কোনও অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছে? তাদের কি স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা আছে? তারা কি যথেষ্ট খাবার পাচ্ছে? এইসব জরুরী প্রয়োজন পূরণ করার পরই কেবল আমরা এমন একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দিকে এগুতে পারি যেখানে ব্যক্তির আত্ম-পরিচয়, সংস্কৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তার মানসিক স্থিতিশীলতা এবং সব রকম চ্যালেঞ্জের ভেতরেও এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে কিনা এই যাবতীয় বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

মানসিকভাবে সুস্থ থাকার পাঁচটি টিপস

১.            আপনার প্রত্যাশাগুলো সমন্বয় করুন। সঠিক চাকরি যথাসময়ে পাওয়া নিয়ে ভয়াবহ চাপ থাকে। এমন একটি পরিকল্পনা তৈরি করুন যা একইসঙ্গে হবে বাস্তবসম্মত এবং যাতে ধাপে ধাপে লক্ষ্যে পৌঁছার পদক্ষেপ থাকবে এবং যেটি আপনার আত্মবিশ্বাস এবং আশাবাদ সমুন্নত রাখতে সহায়ক হবে।

২.            পেছনে যা ফেলে এসেছেন সেই ক্ষতি উপলব্ধি করুন। উন্নততর জীবনের জন্য হলেও নিজের দেশ ছেড়ে আসার বেদনা কখনই শেষ হবার নয়। নতুন সূচনাকে বরণ করে নিতে সেইসব শোক ভুলে যাবার চেষ্টা করুন।

৩.           আপনার নিজস্ব সহায়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন। সঙ্কটের সময় পেশাগত সহায়তা অমূল্য হতে পারে তবে আপনি নিজের কমিউনিটিতে প্রতিদিন যেসব মানুষের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ গড়ে তুলছেন তাদের মাধ্যমে আপনি একটি সহায়ক বোধ নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারেন। এটি আপনার মধ্যে বিচ্ছিন্নতার বোধ কমিয়ে আনতে সহায়ক হবে এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি বোধ তৈরি হবে।

৪.            বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অনেক সংস্থার ঘোষিত লক্ষ্য হলো, “প্রত্যেক দরোজাই সঠিক দরোজা”। সুতরাং ঢুকে যান এবং সহায়তা চান। সামাজিক পরিষেবাগুলোও ক্রমশ আরও বেশি জনঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত হয়ে উঠছে যার অর্থ হলো আপনি প্রথম যে সেবাদাতার কাছে গেছেন তিনি আপনার প্রয়োজন বুঝে আপনাকে অন্য কারো কাছে রেফার করতে পারবেন।

৫.            আর সবশেষ কথা হলো, মনে রাখুন যে আপনি নিঃসঙ্গ নন। আপনার সাহায্য দরকার এটা উপলব্ধি করা এবং অন্যদেরকে আপনার সহায়তায় এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়াটা দুর্বলতার কোনও লক্ষণ নয় বরং সাহসিকতার লক্ষণ। সূত্র : কানাডিয়ানইমিগ্রেন্ট.সিএ