গাঙ্গে না গ্যালে পড়ানডা কেমন জানি করে

single-news-image

(আপলোড: ২০:৫৫, জুলাই, ২০১৮)

রুদ্র রুহান, বরগুনা: 

প্রায় বৃষ্টিবিমুখ আষাঢ় শেষ। ভীষণ বর্ষণ নিয়ে হাজির শ্রাবণ। জ্যৈষ্ঠ থেকেই মূলত উপকূলের জেলেদের ব্যস্ততা বাড়ে। নৌকা জাল সব ঠিকঠাক করে তারা নেমে পড়ে নদ-নদী ও সাগরে। তখন পাথরঘাটা জেলে পল্লিতে পুরুষের দেখা মেলা ভার। কেননা বেশিরভাগ পুরুষ নৌকা জাল নিয়ে ভাসে নদীতে।

বিষখালীর তীর ধরে দক্ষিণে কিছুদূর এগুতেই মজিদের সঙ্গে দেখা। রোদে পোড়া নোনাজলে ভেজা শরীর যেন ইস্পাত দৃঢ়তায়। বয়স পঞ্চান্নর কম হবে না। এই নদী নৌকা জাল আর সাগরের সাথে তাঁর সখ্য সেই কিশোরকাল থেকে। বাবার সাথে জেলে নৌকার হাল ধরেছিলেন। যৌবনে পাকাপোক্ত মাঝি, আর এখন বয়সের ভাটা। তবু হাল ছাড়েননি।

মজিদ বলেন- ‘মোর আব্বায় জাইল্লা আলহে, হে যে নৌকা জাল রাইখ্যা গ্যাছে, হেইয়াই দিয়াই মোর সংসার চলে। খাইয়া থাহি না খাইয়া থাহি, নৌকার হাল ছাড়িনাই বাবা। একদিন মাছ ধরতে যাইতে না পারলে জানি পড়ানডা কেমন করে’। এই মজিদরাই বংশ পরম্পরায় টিকিয়ে রেখেছেন মৎস্যযজ্ঞ।

শেষ বিকেলে পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিপরীতে খালের পাড় ধরে অগোছালো জাল ঠিক করছে কেউ। কেউবা মেরামতের জন্য জাল নৌকা থেকে তীরে তুলছে। প্রকৃতি আর মানুষের প্রতিকূলতা। তবু টিকে থাকার লড়াইয়ে বাপ দাদার পেশা ছাড়েনি। আলাপের মাঝেও কুশীলবের মতো জালের ছেড়া ফাঁস বুনন চলছে অবিরাম। মজিদের চার ছেলে মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে বাবার পেশায় আছে, অন্যজন এবার স্থানীয় কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। তার ইচ্ছে লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করবে। বাবা আর ভাইয়ের আয়ে চলে তাদের সংসার। ইলিশের মৌসুম চলছে। তিনটি ‘খ্যাপে’ গিয়ে খালি হাতে ফিরেছেন। তবে হাল ছাড়ার সুযোগ নেই। কারণ, সাগরেই তাদের জীবন-জীবিকা বাঁধা।

পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে পাঁচ কিলোমিটার দখিনে পদ্মা গ্রাম। এই গ্রাম আর সুন্দরবনের মধ্যে ব্যবধান গড়েছে বলেশ্বর নদ। গোটা গ্রামের প্রতিটি পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস মাছ শিকার। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের উভয় পাশে বসতি। এক চালা দোচালা কাঠের অবকাঠামোয় টিনের ছাউনির ঘর। সৌরবিদ্যুতের প্যানেল শোভা পাচ্ছে প্রায় প্রতিটি চালায়।

কিছুদূর যেতে পদ্মা স্লুইজ বাজার। বেশ কিছু দোকান পাট গড়ে উঠেছে এখানে। চা খেতে খেতে কথা হয় বেশ কয়েকজন জেলের সাথে। তাদের একজন সিদ্দিকুর রহমান। তার তিন ছেলে মেয়ে। সবাই স্কুলে পড়ে। অনেক খরচ সংসারে।

‘গাঙ্গে মাছ পোনা নাই, মাইয়া পোলারে কি আর হেইয়া বুজান যায় ভাইজান? ওগো জামা কাফুর লেহাপড়ার খরচা তো দেওনই লাগে।

-অন্য কোনো কাজে তো যেতে পারেন?

– না দাদা, কোনোখানেই পড়ান টেকে না। মন বসে না। এই গাঙ্গের পানিতে না নামলে ভালো লাগে না।

নানা প্রতিকূলতা। তবু হাল ছাড়তে রাজি নন এই সিদ্দিকরা।

এখানের সবার জীবনের গল্পটা প্রায় একই রকম। ঈদ-পার্বনে ছেলে মেয়েদের আবদার-আনন্দ থাকলেও, পরিবারের কর্তাদের জীবনে থাকে না বিশেষ কোনো বর্ণচ্ছটা।

দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনা।  অন্যদিকে পায়রা বলেশ্বর ও বিষখালী ঘিরে বরগুনা জেলা। এসব নদ-নদীর তীর ঘেঁষা অধিকাংশ বাসিন্দার জীবন জীবিকায় জড়িয়ে আছে মাছ শিকার। খড়ের চালা টিনে রূপান্তর হয়েছে অনেকের।  তবে দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞের দৃশ্যটা বদলায়নি মোটেও। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-প্রকৃতির মোকাবিলা করে টিকে থাকার সংগ্রামের চিত্র যুগের পর যুগ বয়ে চলেছে তারা।

জেলেদের সুখ দুঃখের গল্প শুনতে শুনতে বিকেলের সূর্য ক্রমশ লাল হয়ে টুপ করে ডুব দেয় বলেশ্বরে। অন্ধকার তাড়া দেয় ফিরতে হবে দ্রুত। এগিয়ে যায় সভ্যতা, দেশ, অর্থনীতি। তবে মজিদ বা সিদ্দিকদের বছরের পর বছর কেটে যায় নদী কিংবা সাগরে, পরিবারের আবদার মেটাতে।